কলকাতায় পুরনো বাড়ির অংশ ধসে মর্মান্তিক মৃত্যু, দেওয়ালের নীচে চাপা পড়ে প্রাণ গেল ষাটোর্ধ্ব মহিলার
প্রবল বৃষ্টির মধ্যে কলকাতার পাথুরিয়াঘাটায় পুরনো তিনতলা বাড়ির অংশ ধসে মৃত্যু হল ষাটোর্ধ্ব উর্মিলা সাউয়ের। ঘটনাস্থলে NDRF, শুরু উদ্ধারকাজ।
প্রবল বৃষ্টির মধ্যেই কলকাতায় বড়সড় বিপর্যয়। পাথুরিয়াঘাটার জোড়াবাগান এলাকার ব্রজদুলাল স্ট্রিটে একটি পুরনো তিনতলা বাড়ির অংশ আচমকা ধসে পড়ে মৃত্যু হল এক ষাটোর্ধ্ব মহিলার। ধ্বংসস্তূপের নীচে চাপা পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন উর্মিলা সাউ। ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
জানা গিয়েছে, ৩১ নম্বর ব্রজদুলাল স্ট্রিটের বাড়িটি প্রায় ২০০ বছরের পুরনো। বাড়িটিতে প্রায় ২০ জনের বসবাস ছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। মঙ্গলবার ভোররাতে আচমকাই বাড়িটির একটি অংশ ভেঙে পড়ে। সেই সময় বাড়ির বাসিন্দাদের অনেকেই ভিতরে ছিলেন।
বিকট শব্দ শুনে বাইরে এসেই বিপদ
পরিবারের দাবি, ভোরে বাড়ির ভিতর থেকে আচমকা জোরালো শব্দ শুনে বাইরে বেরিয়ে এসেছিলেন উর্মিলা সাউ। ঠিক সেই সময়ই বাড়ির একটি অংশ হুড়মুড়িয়ে ভেঙে তাঁর উপর পড়ে। ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে পড়েন তিনি। পরে উদ্ধার করা হলেও তাঁর মৃত্যু হয়।
পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারাও দ্রুত উদ্ধারকাজে হাত লাগান। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী বা NDRF। বাড়িতে আটকে থাকা অন্য বাসিন্দাদের উদ্ধারের কাজও শুরু হয়। বেশ কয়েকজনকে ইতিমধ্যেই নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
ছয় মাস আগেও ধস নেমেছিল বাড়িতে
স্থানীয় সূত্রের দাবি, বিপজ্জনক এই বাড়িটির পিছনের অংশের বড় একটি জায়গা প্রায় ছয় মাস আগেই ভেঙে পড়েছিল। তারপর থেকেই বাড়িটির একটি অংশ কার্যত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। কলকাতা পুরসভার তরফে বাড়িটিকে বিপজ্জনক এবং পরিত্যক্ত হিসেবে চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলেও জানা যায়।
তবে বাড়িটি পুরোপুরি খালি করানো সম্ভব হয়নি। বাড়ির মালিকানা ও ভাড়াটেদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিরোধই এর অন্যতম কারণ বলে অভিযোগ। সেই বিবাদ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। এর মধ্যেই বাড়ির একটি অংশে নতুন মালিকপক্ষের সদস্যদের বসবাস নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।
ধসের সময় আটকে পড়েন একাধিক বাসিন্দা
বাড়িটির নিচের তলায় পরিবারের সঙ্গে থাকতেন উর্মিলা সাউ। অন্যদিকে, পিছনের অংশে নতুন মালিকপক্ষের কয়েকজন সদস্যও থাকতেন বলে স্থানীয়দের দাবি। ধসের সময় তাঁরাও আটকে পড়েন। স্থানীয় বাসিন্দাদের তৎপরতায় প্রথম দফায় বেশ কয়েকজনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
ধসের পর বাড়িটির বাকি অংশও যে কোনও সময় ভেঙে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সেই কারণে গোটা বাড়িটি ভেঙে ফেলার বিষয়ে প্রশাসনের তরফে চিন্তাভাবনা চলছে। পাশাপাশি আশপাশের বাড়িগুলির বাসিন্দাদেরও নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে।
উঠছে একাধিক প্রশ্ন
এই ঘটনার পর পুরনো ও বিপজ্জনক বাড়ি নিয়ে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, ছয় মাস আগে বাড়িটির একটি বড় অংশ ভেঙে যাওয়ার পরও কেন সম্পূর্ণ বাড়িটি খালি করা সম্ভব হয়নি? বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটেদের মধ্যে চলতে থাকা আইনি জটিলতার দ্রুত সমাধান কেন হয়নি?
আরও অভিযোগ, ঘটনার আগের রাত থেকেই বাড়িটির বিভিন্ন অংশ থেকে ইট-পলেস্তারা খসে পড়ছিল। বিষয়টি নিয়ে সতর্ক করা হলেও কেন আগাম কোনও বড় পদক্ষেপ করা হয়নি, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোর
বাড়ি ধসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্কও শুরু হয়েছে। সকালে ঘটনাস্থলে যান বিজেপি নেত্রী পূর্ণিমা কোঠারি। তাঁর অভিযোগ, পুরনো প্রশাসনের সময় বিপজ্জনক বাড়ি নিয়ে যথেষ্ট নজরদারি করা হয়নি। এলাকার প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর ইলোরা সাহার ভূমিকা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
তবে রাজনৈতিক অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের বাইরে এই ঘটনায় ফের সামনে এসেছে কলকাতার পুরনো ও জরাজীর্ণ বাড়িগুলির নিরাপত্তার বিষয়টি। পাথুরিয়াঘাটা-সহ উত্তর ও মধ্য কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় অতীতেও পুরনো বাড়ি ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ফলে বিপজ্জনক বাড়িগুলির ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং বাস্তবায়নের দাবি আরও জোরালো হয়েছে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0