পুরসভায় ২৮৪ অবৈধ নিয়োগের দাবি, চাকরিপিছু ৬ লক্ষ! সুজিতের অ্যাকাউন্টে ৮.৮ কোটি! দাবি ইডির
পুরসভা নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় কলকাতা হাই কোর্টে বড় দাবি ইডির। ২৮৪ অযোগ্য নিয়োগ ও চাকরিপিছু ৬ লক্ষ টাকার লেনদেনের অভিযোগ। সুজিত বসুর অ্যাকাউন্টে ৮.৮ কোটি টাকার হদিসের দাবি।
পুরসভায় নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় প্রাক্তন মন্ত্রী সুজিত বসুর বিরুদ্ধে বিস্ফোরক দাবি করল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)। বুধবার কলকাতা হাই কোর্টে জামিনের শুনানিতে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার দাবি, একাধিক পুরসভায় ২৮৪ জন অযোগ্য প্রার্থীকে বেআইনি ভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। প্রতিটি নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রায় ৬ লক্ষ টাকা করে লেনদেনের অভিযোগও আদালতে তুলে ধরেছে ইডি।
সুজিত বসুর জামিনের বিরোধিতা করে ইডির আইনজীবী দাবি করেন, তিনি সাধারণ কোনও অভিযুক্ত নন। প্রভাবশালী ব্যক্তি হওয়ায় জামিন পেলে তদন্ত প্রভাবিত করার আশঙ্কা রয়েছে। মামলাটি আর্থিক তছরুপ প্রতিরোধ আইন বা PMLA-এর অধীনে হওয়ায় তদন্ত এখনও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে বলেও আদালতে জানানো হয়।
‘২৮৪ অযোগ্যকে চাকরি’, আদালতে ইডির দাবি
বুধবার বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের এজলাসে সুজিত বসুর জামিনের আবেদন নিয়ে শুনানি হয়। ইডির দাবি, কামারহাটি, বরাহনগর, টিটাগড়-সহ একাধিক পুরসভায় নিয়োগে অনিয়ম হয়েছিল। যোগ্যতার মানদণ্ড উপেক্ষা করে বহু প্রার্থীকে চাকরি পাইয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
তদন্তকারী সংস্থার দাবি, চাকরিপ্রতি প্রায় ৬ লক্ষ টাকা করে নেওয়া হত। সেই বেআইনি লেনদেনের সঙ্গে সুজিত বসুর যোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
‘সুজিতের অ্যাকাউন্টে ৮ কোটি ৮০ লক্ষ’
আদালতে ইডি আরও দাবি করেছে, সুজিত বসুর একটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে প্রায় ৮ কোটি ৮০ লক্ষ টাকার সন্ধান মিলেছে। পরিবারের অন্য সদস্যদের অ্যাকাউন্টেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থের হদিস পাওয়ার দাবি করেছে তদন্তকারী সংস্থা।
এই বিপুল অর্থের উৎস কী, তার সঙ্গে পুরসভায় নিয়োগের কোনও সম্পর্ক রয়েছে কি না এবং অর্থ কোথায় বিনিয়োগ করা হয়েছে—এসব বিষয় খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। ইডির দাবি, অভিযুক্তদের বিনিয়োগের একটি অংশ শেয়ার বাজারেও রয়েছে।
১৫২ চাকরিপ্রার্থীর নাম সুপারিশের অভিযোগ
ইডির বক্তব্য অনুযায়ী, নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় গ্রেফতার হওয়া অয়ন শীলের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া ডিজিটাল তথ্য তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিয়েছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে দক্ষিণ দমদম পুরসভায় ১৫২ জন চাকরিপ্রার্থীর নাম সুজিত বসু সুপারিশ করেছিলেন বলে দাবি করেছে ইডি।
এই প্রসঙ্গে নিতাই দত্তের নামও আদালতে উল্লেখ করা হয়। তদন্তকারীদের দাবি, তাঁর মাধ্যমে চাকরিপ্রার্থীদের নাম সুপারিশ করা হত। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেও নিয়োগ সংক্রান্ত বেশ কিছু তথ্য পাওয়া গিয়েছে বলে আদালতে জানায় ইডি।
OMR কারচুপির অভিযোগ
পুরসভায় নিয়োগের ক্ষেত্রে OMR শিটে কারচুপির অভিযোগও আদালতে তুলেছে ইডি। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, যোগ্য প্রার্থীরা সঠিক উত্তর দেওয়া সত্ত্বেও তাঁদের উত্তরকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি এবং অযোগ্য প্রার্থীদের সুবিধা করে দেওয়া হয়েছিল।
এমনকি বিভিন্ন পুরসভার চেয়ারম্যান, চেয়ারম্যান-ইন-কাউন্সিল এবং ভাইস চেয়ারম্যানের সুপারিশের ভিত্তিতেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে কেন্দ্রীয় সংস্থা।
‘নিয়োগ দুর্নীতির টাকা আর্থিক তছরুপ’
ইডির বক্তব্য, বেআইনি নিয়োগের মাধ্যমে যে অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছিল, তা পরে বিভিন্ন খাতে ব্যবহার করা হয়েছে। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, এই অর্থের উৎস গোপন করে বিভিন্ন জায়গায় বিনিয়োগ বা স্থানান্তর করা হয়ে থাকলে তা আর্থিক তছরুপের আওতায় পড়ে।
এই মামলায় পুরসভায় নিয়োগ সংক্রান্ত তদন্তে আরও কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নাম উঠে এসেছে বলেও আদালতে জানানো হয়েছে। তাঁদের ভূমিকা নিয়েও তদন্ত চলছে বলে ইডির দাবি।
জামিন নিয়ে আদালতের প্রশ্ন
অন্যদিকে, শুনানির সময় বিচারপতি শুভ্রা ঘোষ ইডির কাছে জানতে চান, সুজিত বসুকে হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনীয়তা কতটা। তাঁকে জেলে রাখলে তদন্তে নতুন কী তথ্য পাওয়া সম্ভব, সেই প্রশ্নও ওঠে।
ইডির পক্ষ থেকে জানানো হয়, তদন্ত এখনও শেষ হয়নি এবং আর্থিক লেনদেনের জাল ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সেই কারণে জামিন দিলে তদন্ত প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে দাবি করে কেন্দ্রীয় সংস্থা।
তবে আদালতে ওঠা সমস্ত অভিযোগই এই মুহূর্তে তদন্তকারী সংস্থার দাবি। অভিযোগগুলির চূড়ান্ত সত্যতা এখনও বিচারাধীন এবং আদালতের রায়ের উপরই তা নির্ভর করবে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0