দিল্লিতে আসছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট! ডলার-নির্ভরতা কমানোর আলোচনায় নতুন সমীকরণ
ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে সেপ্টেম্বরে দিল্লি আসছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য ও ডলার-নির্ভরতা কমানোর আলোচনা ঘিরে বাড়ছে আন্তর্জাতিক আগ্রহ।
ভারতে আয়োজিত হতে চলা ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে দিল্লি। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান আগামী সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেবেন বলে খবর। ভারত চলতি বছর ব্রিকসের সভাপতিত্ব করছে এবং আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার কথা।
ইরানের প্রেসিডেন্টের এই সফরকে ঘিরে শুধু ভারত-ইরান সম্পর্ক নয়, ব্রিকসের অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা জোরদার হয়েছে। তবে ব্রিকসের নিজস্ব অভিন্ন মুদ্রা চালুর কোনও সিদ্ধান্ত এখনই হয়েছে—এমনটা বলা ঠিক হবে না। বরং ডলারের উপর নির্ভরতা কমানো এবং সদস্য দেশগুলির নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্যের সম্ভাবনাই বর্তমানে বেশি আলোচনায়।
ব্রিকস মঞ্চে ইরানের গুরুত্ব বাড়ছে
ইরান ২০২৪ সালে ব্রিকসের সদস্য হয়। তারপর থেকেই তেহরান উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্য ও আর্থিক সহযোগিতা আরও বাড়াতে আগ্রহ দেখিয়েছে। সম্প্রতি ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের গভর্নর জানিয়েছেন, দেশটি ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্কে যোগ দেওয়ার পথে এগোচ্ছে। একইসঙ্গে ব্রিকসের অন্যান্য দেশের সঙ্গে জাতীয় মুদ্রায় বাণিজ্য এবং আর্থিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও ইরানের আগ্রহ রয়েছে।
ফলে পেজেশকিয়ানের দিল্লি সফরকে শুধু একটি কূটনৈতিক সফর হিসেবে দেখা হচ্ছে না। ব্রিকসের আর্থিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে ইরানের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
‘ব্রিকস মুদ্রা’ কি সত্যিই আসছে?
ব্রিকসের নিজস্ব একটি অভিন্ন মুদ্রা চালুর সম্ভাবনা নিয়ে গত কয়েক বছর ধরেই আলোচনা চলছে। তবে বর্তমানে সেই পথে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেই। বরং ভারত সম্প্রতি স্পষ্ট করেছে যে ব্রিকসের মধ্যে আলাদা কোনও অভিন্ন মুদ্রা চালুর পক্ষে নয়।
এর পরিবর্তে সদস্য দেশগুলির স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন, সীমান্তপার বাণিজ্যের বিকল্প ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কও ব্রিকস দেশগুলির কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের ডিজিটাল মুদ্রাগুলির মধ্যে সংযোগ তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছিল বলে রিপোর্টে উঠে এসেছে।
ডলারের আধিপত্য কি কমবে?
বিশ্ব বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় মার্কিন ডলারের গুরুত্ব এখনও অত্যন্ত বেশি। তাই ব্রিকস দেশগুলির মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়লেও অল্প সময়ের মধ্যে ডলারের আধিপত্য পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে—এমন দাবি করার মতো পরিস্থিতি এখনও তৈরি হয়নি।
তবে রাশিয়া, ইরান-সহ একাধিক দেশ মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও ডলার-নির্ভর আর্থিক ব্যবস্থার বিকল্প নিয়ে আগ্রহী। ইরানের ক্ষেত্রে এই আগ্রহ আরও স্পষ্ট হয়েছে। নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্কে যোগ দেওয়ার উদ্যোগ এবং জাতীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানোর ইচ্ছা তারই ইঙ্গিত বলে মনে করা হচ্ছে।
দিল্লি সফরে কী হতে পারে?
পেজেশকিয়ানের সফরে ভারত-ইরান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পাশাপাশি ব্রিকসের ভিতরে আর্থিক সহযোগিতা, বাণিজ্য, জ্বালানি, সংযোগ এবং পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পেজেশকিয়ানকে ভারতে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
সব মিলিয়ে, ইরানের প্রেসিডেন্টের দিল্লি সফর ব্রিকসের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে নতুন আলোচনার দরজা খুলতে পারে। তবে ‘ডলারের আধিপত্য খতম’—এখনই এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো অতিরঞ্জিত হবে। বরং বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলার-নির্ভরতা কমানোর জন্য বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থার দিকে ব্রিকসের আগ্রহ বাড়ছে—এটাই আপাতত বড় খবর।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0