মানুষ-পশু-পরিবেশের রোগ ঠেকাতে জেলায় জেলায় ‘ওয়ান হেলথ’ কমিটি, নয়া নির্দেশিকা রাজ্যের

নিপা, ইবোলা, বার্ড ফ্লু, রেবিস, লেপ্টোস্পাইরোসিসের মতো সংক্রমণ মোকাবিলায় জেলায় জেলায় ‘ওয়ান হেলথ’ কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ স্বাস্থ্য দফতর। মানুষ, পশু-পাখি এবং পরিবেশের পারস্পরিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়ে রোগের উৎস চিহ্নিত ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসক, পশুচিকিৎসক, প্রশাসন, বন দফতর ও পরিবেশ সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞদের নিয়ে যৌথভাবে কাজ করবে এই কমিটি।

Oct 5, 2026 - 20:05
 0  3
মানুষ-পশু-পরিবেশের রোগ ঠেকাতে জেলায় জেলায় ‘ওয়ান হেলথ’ কমিটি, নয়া নির্দেশিকা রাজ্যের

মানুষের শরীরে সংক্রমিত একাধিক রোগের উৎস শুধু মানুষ নয়। পশু-পাখি, পরিবেশ, জল, খাদ্য কিংবা কৃষিজ উপাদানের মাধ্যমেও বিভিন্ন সংক্রামক রোগ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই ধরনের রোগের মোকাবিলায় শুধু হাসপাতাল ও চিকিৎসা পরিষেবার উপর নির্ভর না করে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। সেই লক্ষ্যেই জেলায় জেলায় ‘ওয়ান হেলথ’ কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য দফতরের নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রতিটি জেলায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ও স্বাস্থ্য আধিকারিকদের নিয়ে এই কমিটি তৈরি করা হবে। রোগের উৎস চিহ্নিত করা থেকে শুরু করে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং সম্ভাব্য নতুন রোগের ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমন্বিতভাবে কাজ করবে কমিটি।

‘ওয়ান হেলথ’ ধারণার মূল বক্তব্য হল মানুষের স্বাস্থ্যকে পশুস্বাস্থ্য এবং পরিবেশের স্বাস্থ্য থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। কোনও সংক্রমণের উৎস যদি পশু বা পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে শুধুমাত্র রোগীর চিকিৎসা করে সেই সংক্রমণের শৃঙ্খল পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন একাধিক বিভাগের সম্মিলিত উদ্যোগ।

রাজ্যের প্রস্তাবিত জেলা স্তরের কমিটিতে থাকবেন জেলাশাসক, জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক, প্রাণিসম্পদ বিকাশ দফতরের ডেপুটি ডিরেক্টর, সংশ্লিষ্ট মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ, ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসার, ভেটেরিনারি ল্যাবরেটরির দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক, পুরসভার প্রতিনিধি, জেলা পরিষদের সভাপতি এবং গ্রামোন্নয়ন দফতরের আধিকারিকরা।

এই সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় রোগের নজরদারির ক্ষেত্রে পশু-পাখির পাশাপাশি পরিবেশগত পরিস্থিতিকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে। বিশেষ করে ডেঙ্গু বা ম্যালেরিয়ার মতো রোগের ক্ষেত্রে মশার বংশবিস্তার, জল জমার পরিস্থিতি, আবহাওয়া এবং স্থানীয় পরিবেশের পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলিও নজরে রাখা প্রয়োজন।

শুধু প্রাণী থেকে সংক্রমণের সম্ভাবনাই নয়, খাদ্য ও কৃষিজ উপাদান এবং পরিবেশগত বিভিন্ন কারণ থেকেও মানুষের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব পড়তে পারে। ফলে স্বাস্থ্য, প্রাণিসম্পদ, বন, স্থানীয় প্রশাসন এবং খাদ্য নিরাপত্তার মতো বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে তথ্য আদানপ্রদান ও সমন্বয় বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে এই উদ্যোগে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিপা ভাইরাসের মতো জুনোটিক রোগের ক্ষেত্রে এই ধরনের সমন্বিত নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ। ফলখেকো বাদুড়ের মতো প্রাণীর মাধ্যমে ভাইরাস সংক্রমণের সম্ভাবনা পর্যবেক্ষণ করা থেকে শুরু করে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের মতো জনস্বাস্থ্য সমস্যার মোকাবিলাতেও ‘ওয়ান হেলথ’ পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে।

প্রাণী ও মৎস্য বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরাস বিশেষজ্ঞ সিদ্ধার্থ জোয়ারদারের মতে, জেলা স্তরে এই ধরনের কমিটি গঠন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সার্স, মার্স, ইবোলা এবং কোভিড-১৯-এর মতো সংক্রামক রোগের অভিজ্ঞতা মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণীস্বাস্থ্য ও পরিবেশকে একসঙ্গে বিবেচনা করার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট করেছে।

আন্তর্জাতিক স্তরেও গত কয়েক দশকে ‘ওয়ান হেলথ’ ধারণার গুরুত্ব বেড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য, প্রাণীস্বাস্থ্য, খাদ্য উৎপাদন এবং পরিবেশ—এই চারটি ক্ষেত্রকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে রোগ প্রতিরোধের কৌশল তৈরির উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে জেলা স্তরে নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ সেই বৃহত্তর সমন্বিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থারই অংশ।

এখন লক্ষ্য, কোনও রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটার পর শুধুমাত্র চিকিৎসার উপর নির্ভর না করে তার সম্ভাব্য উৎস ও সংক্রমণের পথ আগেভাগে শনাক্ত করা। জেলা প্রশাসন থেকে চিকিৎসা ব্যবস্থা, পশুস্বাস্থ্য এবং পরিবেশ—সব পক্ষকে একই কাঠামোর মধ্যে এনে রোগ প্রতিরোধে নজরদারি জোরদার করাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0